ঈমানের পরিচয়

ঈমান আরবী শব্দ।

 

 

 

এর আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, বিশ্বাস স্থাপন করা। আর পারিভাষিক অর্থ হচ্ছে, দৃশ্যমান এই বিশ্ব চরাচর এবং এর মাঝে যাবতীয় সৃষ্টি যেমন মানব, দানব, গ্রহ, নক্ষত্র, চন্দ্র, সূর্য, সাগর-মহাসাগর, জীব-জানােয়ার, গীরি-উপত্যকা, গাছপালা, কীট-পতঙ্গ, ফুল-ফল, এক কথায় যা কিছু আমরা দেখি বা অনুভব করি এই সবের প্রতিপালক ও তার,সৃষ্টি সম্পর্কে স্রষ্টার প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা।

এই অমূল্য সম্পদ, একজন মুসলমানের ব্যক্তি জীবনে বা বাস্তব জীবনে প্রতিফলন ঘটাতে কিসের প্রয়ােজন? বা তা কিসের উপর নির্ভরশীল, তা আমাদের প্রিয় নবী হযরত রাসূলে (সঃ) কতইনা সুন্দরভাবেই আমাদের সম্মুখে তুলে ধরেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেনঃعن ابن عمر رضى الله عنهما قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم. بنى الإسلام على خمس – شهادة أن لا اله الا الله وأن محمد عبده رسوله واقام الصلوة وابناء الثروة والحج وصوم رمضان -অর্থাৎ:- হযরত ইবনে ওমর (রাঃ) হতে বর্ণিত, নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, ইসলামের ভিত্তি পাচটি জিনিসের উপর,

যথা- ১। শাহাদাত বা সাক্ষ্য প্রদান করা যে, আল্লাহ ব্যতীত অন্য কোন ইলাহ বা উপাস্য নেই আর নিশ্চয়ই হযরত মুহাম্মদ (সঃ) আল্লাহর পক্ষ থেকে তার মনােনীত এ প্রেরিত রাসূল।

 ২। নামায কায়েম করা অর্থাৎ (ইবাদত বন্দেগীসমূহকে ব্যক্তি জীবনে তথা সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠিত করা)।

৩। যাকাত প্রদান করা (অর্থাৎ মালী ইবাদতসমূহের প্রতিবিধান করা)।

৪। হজ্জ ব্রত পালন করা।

৫। পবিত্র রমযান মাসে (পূর্ণ এক মাস) রােযা পালন করা। (বুখারী)এতেই প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ ও তাঁর প্রেরিত রাসূল (সঃ)-এর প্রতি আত্মসমর্পণ তথা আনুগত্য স্বীকার করে আদেশ নিষেধ মেনে তারই নির্দেশিত পথে চলার মূলেই ঈমান তথা ইসলামের মূল ভিত্তি স্থাপিত।

এই বিশ্ব-চরাচরে আল্লাহর সকল সৃষ্টি যথা, চন্দ্র-সূর্য, গ্রহ-নক্ষত্র, পশু-পক্ষী, গাছ-পালা, পাহাড়-পর্বত, নদী-নালা সবই আল্লাহর একত্ব স্বীকার করছে এবং তাঁরই নির্দেশিত পথে নিয়ন্ত্রিত।যেহেতু আমরা মানুষ, কেনইবা তার পথের দিশা ছেড়ে বিপথে চলব? তাঁর নির্দেশিত পথে চললেই তাে আমরা অমূল্য সম্পদ ঈমান তথা ইসলামের অধিকারী হবাে।

আর সেই মতে চলাই আমাদের একান্ত কাম্য হওয়া কর্তব্য । ইসলামের প্রথম বুনিয়াদ ঈমান বা বিশ্বাস। ঈমান শব্দটি পবিত্র কোরআনে দুটি ভিন্ন অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমতঃ ঈমান দ্বারা আল্লাহ ও রাসুল (সঃ)-এর প্রতি বিশ্বাসের কথা মুখে উচ্চারণ করার চেয়ে আর কিছু বুঝায় না।

দ্বিতীয়তঃ এ মৌলিক স্বীকতির সাথে অন্তরের সংযােগ থাকতে হবে এবং ঈমানের বিষয়বস্তু কর্মে বাস্তবায়িত করতে হবে।কোরআনে ব্যবহৃত ঈমান’ শব্দের তাৎপর্য হল মুখে সত্যের স্বীকৃতি দেয়া, অথবা আন্তরিক স্বীকৃতি দেওয়া, অথবা সকার্য সম্পাদন করা, অথবা এ তিনের সমন্বয় সাধন করা। কিন্তু প্রায় সকল ক্ষেত্রেই স্বীকৃত হয়েছে যে, ঈমান এ তিনটি বিষয়ের বাস্তব রূপায়ণ ব্যতীত পরিপূর্ণতা লাভ করে না।

ইমাম মালেক, আহমদ ও শাফেয়ী (রঃ) এর অভিমত হলالايمان هو التصديق بالجنان والاقرر باللسان والعملبالاركان -অর্থাৎঃ “আন্তরিক বিশ্বাস, মৌখিক স্বীকৃতি এবং কাজে পরিণত করার নামই হচ্ছে ঈমান।”ঈমানের সজ্ঞায় কেউ কেউ বলেনالايمان هو الصديق بما جاء به من عند الله تعالیঅর্থাৎ :- “আল্লাহর পক্ষ হতে যা এসেছে তাতে আন্তরিক বিশ্বাস ও মৌখিক স্বীকারােক্তির নাম হচ্ছে ঈমান।” মােটকথা :- ঈমান অর্থ বিশ্বাস, সারাজাহানের সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তায়ালা আসমান যমীন, চাঁদ-সূর্য, গ্রহ-উপগ্রহ, গাছ-পালা, মানব-দানব, জীব-জন্তু, পাহাড়-পর্বত, নদী নালা প্রভৃতি যা কিছু আছে সব কিছুর তিনিই স্রষ্টা, তিনিই সব কিছুর পরিচালক ও প্রতিপালক।

জীবন ও মৃত্যু, সৃষ্টি ও ধ্বংস তাঁর ইচ্ছাতেই সংঘটিত হয়, তিনি যা ইচ্ছে করেন তা-ই হয়, মানব জাতিকে তিনি দুনিয়ার বুকে তার প্রতিনিধিত্ব করার জন্য সৃষ্টি করেছেন। মানুষকে সৎপথে পরিচালিত করার জন্য সত্যের সন্ধান ও আলাের দিশা দেয়ার জন্য নবী-রাসূল মনােনীত করেছেন এবং তাদের নিকট ফেরেশতা মারফত ওহী পাঠিয়েছেন।

এ জীবন ক্ষণস্থায়ী, নির্দিষ্ট মেয়াদ শেষ হলে সকলের মৃত্যুর মাধ্যমে আল্লাহর নিকট ফিরে যেতে হবে, মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হবে। তখন ইহ-জীবনের যাবতীয় পাপ-পুণ্যের হিসেব দেয়ার জন্য সকলকেই হাশর ময়দানে সমবেত হতে হবে। পুণ্যবান লােকদেরকে তিনি পুরস্কৃত করবেন আর পাপীদের শাস্তি দিবেন।

এ সকল বিষয় এবং এর আনুসঙ্গিক আরাে কিছু বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন করার নাম হচ্ছে ঈমান।