সালাতে এত সব মনে কেন জাগে? কখনো কি জানতে চেয়েছেন এর কারণগুলা

অনেক জটিল হিসাবও সলাত রত অবস্থায় সহজেই মিলে যায় । সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া যায় কঠিন থেকে কঠিনতর ব্যাপারে। স্মরণে এসে যায় অনেক পুরনাে ছােট-খাট আজগুবি আর অবান্তর বিষয়,এর মধ্যে অনেক চিন্তা আছে যা মনের খেয়ালে এমনিতে আসে আবার এমনিতেই চলে যায়।

আবার এমন কিছু চিন্তা ভাবনাও আছে যা মুসল্লীর প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ে ঘটে থাকে,ব্যক্তি ভেদে সলাতের মধ্যে এমনটি হওয়ার বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে,আমার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে কয়েকটি কারণ আলােচনা করা হলাে।

১. সলাতকে নিছক ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা মনে করা:

মুখস্থ কিছু সূরাহ ও দু’আ মন্ত্রের মত পড়ে যাওয়া, রুকু করা, এর পর সিজদাহ করা। তাশাহুদ শেষে সালাম ফিরানাে সঙ্গে সঙ্গে হাত তুলে মুনাজাত, অতঃপর মুখের উপর হাত বুলানাে, (কেউ কেউ আবার চু চু শব্দ করে) শাে শাে করে মাসজিদ থেকে বের হওয়া, পুরােটাই যেন যান্ত্রিকতা আর আনুষ্ঠানিকতা। সলাতের সাথে অন্তরের যে যােগসাজস আছে তা থেকে অধিকাংশ মুসল্লী বহুদূরেই রয়ে গেছে। সেটা তাদের দিকে দৃষ্টিপাত করলেই বুঝা যায়।
অন্তরের খবর আল্লাহই ভাল জানেন।

২. সলাতকে যথাযথ গুরুত্ব না দেয়া:

অনেকেই সলাতের প্রকৃত মর্যাদা ও স্বরূপ যথাযথভাবে অনুধাবন করতে পারে না। পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করলেও এটাকে অন্যান্য কাজের মত সাধারণ ও নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার মনে করে।

৩. পাপ কাজে ডুবে থাকা:

নিয়মিত সলাত আদায় করা সত্ত্বেও প্রকাশ্যে ও নিয়মিত পাপ কাজে জড়িয়ে থাকা মুসল্লীর সংখ্যা নেহায়েত কম নয়। এই পাপ কাজ তাকে সলাতে অন্যমনস্ক করে দেয়। এছাড়া হঠাৎ কোন পাপ কাজ করে ফেলার পর তা হতে খালিসভাবে তাওবা না করলে সলাতের মধ্যে তা এমনভাবে স্মরণে আসতে পারে যে সে ভাবনা থেকে ফিরে আসা অসাধ্য হয়ে পড়ে। যে মুসুল্লী টিভি দেখেন সলাতরত অবস্থায় তার চোখের সামনে কোন অভিনেতা অভিনেত্রীর চেহারা বা কোন বিশেষ দৃশ্য ভেসে উঠবে এটা অস্বাভাবিককিছু না, তখন আমার বিস্ময়ের সীমা থাকে না যখন দেখি কোন মুসল্লী সিনেমা দেখার ফাকে (অ্যাড, সংবাদ, আযান, ইত্যাদির জন্য বিরতির সময়) দ্রুত তার সলাত শেষ করে নেয়। নিয়মিত গান শােনে ও গুনগুনিয়ে গায়এমন মুসুল্লীদের সলাতের মধ্যে মনে মনে গান গাওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। এমনকি কুরআন তিলাওয়াতের পরিবর্তে মুখে গানও চলে আসতে পারে।

৪. অর্থ না বুঝা:

সলাত আদায় করতে হয় পুরােটাই আরবী ভাষায়, আমাদের মাতৃভাষা বাংলা হওয়ায় অধিকাংশ লােক বুঝতে পারেনা সে আল্লাহ’তালার সামনে দাড়িয়ে তারই সাথে কী গােপন কথপােকথন করছে সে কিয়ামে, রুকু-সিজদাতে এবং তাশাহুদের বৈঠকে কিভাবে আল্লাহর নিকট নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করছে, কী চাচ্ছে আল্লাহর নিকট তার কিছুই বুঝতে পারে না। যদিও বা কেউ অর্থ জানে তার পরও সে অলস অন্তরে মুখে মন্ত্রের মত উচ্চারণ করে যার ফলে তার অবস্থাও এ সকল লােকের মতই হয় যারা মোটেই সলাতের অর্থ জানে না।

৫, আখিরাতের তুলনায় দুনিয়াকে অগ্রাধিকার দেয়:

আজকাল অধিকাংশ মানুষ দুনিয়া নিয়ে এতটাই ব্যস্ত থাকে যে প্রতিফল দিবস নিয়ে ভাববার অবসরটুকুও পায় না। কী করলে কী হবে, কী করা উচিত ছিল, কী করা দরকার, কিভাবে এটা হাসিল করা যায় এবং এজন্য কাকে কিভাবে ফাঁকি দিতে হবে ইত্যাদি চিন্তা মানুষকে সদা ব্যস্ত রাখে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য, বাড়ি-গাড়ি সুন্দরী নারী, অর্থ-সম্পদ অর দুনিয়ার জৌলুস অর্জনের জন্য মানুষ কতই না পরিশ্রম করে আর সর্বদা চিন্তামগ্ন থাকে। এমতাবস্থায় সে যখন মসজিদে যায় তখন আল্লাহ’তালার সান্নিধের চেয়ে তার ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মতৎপরতার চিন্তা-ফিকিরই বেশি প্রাধান্য পায়। কারণ কোলাহলমুক্ত পরিবেশে নীরবে দাঁড়িয়ে বুদ্ধি আঁটিা কতইনা সহজ এবং ফলপ্রসূ তার উপর আবার শয়তানের সহযােগিতা।

৬. জায়নামাজ ও মাসজিদে নকশা-কারুকার্য:

মসজিদের মিহরাবের দুদিকে মাক্কা-মাদিনার ছবিসহ বিভিন্ন ধরণের নকশা দ্বারা মনােরম করে সাজানাে হয় যা সলাতের একাগ্রতা নষ্ট করে। এছাড়াও সামনের দেয়ালে ঘড়ি, সলাতের সময়-সূচি, বিভিন্ন মসজিদের ছবি সম্বলিত ক্যালেন্ডার, বুক সেলফ ইত্যাদি সলাতে বিঘ্ন ঘটায়। সামনের বুক সেলফ কাচে আচ্ছাদিত থাকলে তাতে মুসল্লীদের প্রতিচ্ছবি ভেসে উঠে যদি কোন পদা না দেয়া হয়। জায়নামাজের মধ্যে অংকিত বিভিন্ন ধরনের নকসা দৃষ্টি কেড়ে নেয় এবং প্রশ্নের উদ্রেক করে। এ সমস্যা এতটাই প্রকট যে এর একমাত্র সমাধান হলাে এগুলাের অপসারণ ।
ضلي في خميصة لها أغلام وقال شغلتني أغلام عن عائشة أن اللي هو قاذهبوا بها إلى أبي جهم وأثوني بتيجانيه


“আয়িশাহ রাঃ থেকে বর্ণিতঃ

একদিন নবী কারীম ﷺ
একখানা নক্সা অংকিত কাপড়ের মধ্যে সলাত আদায় করলেন এবং (সলাত শেষে) বললেন, এই কাপড়ের নকসা ও কারুকার্য আমার মনােযােগ আকর্ষণ করে নিয়েছে। এটা নিয়ে আবু জাহমের কাছে যাও এবং তার সাদামাটা মােটা চাদরখানা আমাকে এনে দাও।”
يصلي في خميصة ذات أغلام نظر عن عائة قالت قام رسول الله إلى عليها فلما قضى صلاته قال اذهبوا بهذه الحميضة إلى أبي جهم بي
دية وأثوني بأنبجانيه فإنها ألقتني أيقا في صلاتي


“আয়িশাহ রাঃ থেকে বর্ণিতঃ

তিনি বলেন, একখানা নক্সা ও কারুকার্য করা চাদরে রাসূলুল্লাহ ﷺ সলাত আদায় করতে দাঁড়ালেন। সলাতের মধ্যে তিনি এর নক্সার প্রতি দেখতে থাকলেন।
(অর্থাৎ কাপড়খানার নকশা ও কারুকার্য সলাতে তার একাগ্রতা নষ্ট করে দিলাে।)
তাই সলাত শেষে তিনি বললেনঃ এ চাদরখানা নিয়ে আবূ জাহম ইবনু হুযাইফাহ’র কাছে যাও। আর আমাকে তার কম্বলথানা এনে দাও। কারণ এ চাদরখানা এখন সলাতের মধ্যে আমাকে অন্যমনস্ক করে ফেলছে।

সহীহ মুসলিম

৭, সলাতের হুকুম আহকাম ঠিকমত পালন না করা

৮. শয়তানের প্রভাব:

সলাত হচ্ছে সর্বশ্রেষ্ঠ ইবাদাত আর শয়তান মানুষের প্রকাশ্য ও বড় শ্ত্রু। বান্দার সলাতের মধ্যে গণ্ডগোল সৃষ্টি করা শয়তানের নীতিগত দায়িত্ব এবং এ কাজের জন্য নির্দিষ্ট শয়তান নিয়ােজিত থাকে।

فقال يا رسول الله إن الظان أن عثمان بن أبي العاص أتى اللي قد حال بيني وبين صلاتي وقراءتي يلبسها على فقال رسول الله و ذالك

زب فإذا أخ ته فتعوذ بالله منه واثقل على يسارك شيطان يقال له ثلاثا قال ففعلت ذلك فأذهبه الله عني

উসমান বিন আবুল আস রাঃ রাসূল ﷺ   কে বললেন, হে আল্লাহর রাসূল  ﷺ শয়তান আমার মধ্যে এবং আমার সলাত ও কিরাআতের মধ্যে অন্তরায় হয়ে আমার ক্বিরা’আতে জটিলতা সৃষ্টি করে। রাসূল্লাহ ﷺ বললেন, এ হচ্ছে শয়তান, যাকে ‘খানযাব’’ বলা হয়। তুমি তার আগমন অনুভব করলে আল্লাহর নিকট তিন বার আশ্রয় কামনা করবে এবং বাম দিকে তিনবার থুথু ফেলবে। তিনি (উসমান) বলেন: এরপর থেকে আমি এমনটি করি ফলে আল্লাহ তাকে আমার কাছ থেকে দূরে সরিয়ে দেন।

عن الانيقات في الصلاة فقال هو عن عاية قالث سأل رسول الله اختلال يختله الشيطان من صلاة الغبي

‘আয়িশাহ রাঃ  হতে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি আল্লাহর রসূল (স) কে সলাতে এদিক ওদিক তাকানাে সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেনঃ এটা এক ধরনের ছিনতাই, যার মাধ্যমে শয়তান বান্দার সলাত হতে অংশ বিশেষ কেড়ে নেয়।

قال إن الشيطان إذا سيع البناء بالصلاة عن أبي هريرة عن النبي أحال له صراط حتى لا يسمع صوته فإذا سكت رجع قوسوس فإذا سمع:

الإقامة ذهب حتي لا تسمع صوته فإذا شگت رجة فوسو

আবু হুরায়রাহ রাঃ হতে বর্ণিত।রাসুল ﷺ  বলেন: শয়তান যখন সলাতের আযান শুনতে পায় তখন বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পালাতে থাকে।

যেন আযানের শব্দ তার কানে পৌঁছতে না পারে। মুয়াযিন যখন আযান শেষ করে তখন সে ফিরে এসে (সালাত আদায়কারীর মনে) সংশয়-সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকে। সে পুনরায় যখন ইকামত শুনতে পায়। আবার পলায়ন করে যেন এর শব্দ তার কানে না যেতে পারে যখন ইকামাত শেষ হয় তখন সে ফিরে এসে (সলাত আদায়কারীদের সংশয় সন্দেহ সৃষ্টি করতে থাকে।”

قال إذا نودي للصلاة أدبر الشيطان وله عن أبي هريرة أن رسول الله را حتى لا يتم التأذين إذا قضى الياء أقبل حتى إذا ثوب بالصلاة أدبر حتى إذا قضى اللثويب أقبل حتى خطر بين المرء وفيه يقول اذكر

م صلی كذا اذكر كذا لما لم يكن يدرى بطل الرجل لا يدري

আবু হুরায়রাহ হ হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আল্লাহর রসূল ﷺ বলেছেন ? যখন সলাতের জন্য আযান দেয়া হয়, তখন শয়তান হাওয়া ছেড়ে পলায়ন করে, যাতে সে আযানের শব্দ না শােনে। যখন আযান শেষ হয়ে যায়, তখন সে আবার ফিরে আসে। আবার যখন সলাতের জন্য ইক্বামত বলা হয়, তখন আবার দূরে সরে যায়। ইকামাত শেষ হলে সে পুনরায় ফিরে এসে লােকের মনে কুমন্ত্রণা দেয় এবং বলে এটা স্মরণ কর, ওটা স্মরণ কর, বিস্মৃত বিষয়গুলাে সে মনে করিয়ে দেয়। এভাবে লােকটি এমন পর্যায়ে পৌছে যে, সে কয় রাকআত সলাত আদায় করেছে তা মনে করতে পারে না।

قال إن أحدكم إذا عن أبي هريرة رضي الله عنه أن رسول الله

عليه حتى لا يدري كم صلى فإذا وجد قام يصلي جائه الشيطان قلبي ذلك أحدكم فليسجد سجدتين وهو جالس

আবু হুরায়রাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, তােমরা কেউ যখন সলাতে দাঁড়াও তখন শয়তান তার কাছে এসে তাকে সন্দেহ ও দ্বিধা-স্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেয়। এমনকি সে কয় রাক’আত সলাত আদায় করলো তাও স্মরণ করতে পারে না। তােমরা কেউ এরূপ অবস্থা হতে দেখলে সে যেন বসে বসেই দু’টি সাজদাহ করে নেও।